বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪২ অপরাহ্ন
শিরোনাম
গোপালগঞ্জে জামায়াতের উদ্যোগে সাংবাদিকদের সম্মানে আলোচনা ও ইফতার মাহফিল গোপালগঞ্জে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল নুসরাত, স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার গোপালগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে চাকরি মেলা’ অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জে ভূমিকম্পের কম্পন গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালের সামনে ম্যানহোলের পাশে রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখা: বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন মাসে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ঘোষণা এমপি ডা. কে এম বাবরের গোপালগঞ্জে যাকাতের অর্থে সেলাই মেশিন ও আর্থিক অনুদান বিতরণ গোপালগঞ্জে অগ্নিবীনা শিল্প ও সাহিত্য সংসদ এর উদ্যোগে ভাষা দিবস পালিত   ও ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জে বিনম্র শ্রদ্ধায় মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত গোপালগঞ্জে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলাদেশ এক্সটেনশন এডুকেশন সার্ভিসেস (বিজ)-এর শিক্ষা কর্মসূচীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাংবাদিক সারমাত: খবরের পেছনের ছুটে চলা এক নিবেদিত প্রাণ

  • Update Time : রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৫, ১.৫৪ পিএম
  • ৫১৭ Time View

মুহাম্মদ আলম:
নিবেদিত এক সাংবাদিক মাহবুব হোসেন সারমাত। খবর সংগ্রহ করাই ছিল তার নেশা। অন্য সাংবাদিকদের মতো নিজ জীবনের খবর তার কাছে ছিল মূল্যহীন। বুকের হৃদকম্পন ঠিকভাবে কাজ করছে না। তারপরও সে ছুটে যেত অকুস্থলে। খবরের পেছনের খবর তার লাগবেই। এ যেনো এক আজব নেশা! হয়ত তার নীতি ছিল, হৃদকম্পনের সাথে আপোষ চলে । কিন্তু মনগড়া তথ্যের সাথে নয়। সঠিক তথ্য তুলে আনতে সে ছুটতো ঘটনাস্থলে। যাত্রাপথ যতই বন্ধুর হোক।
বাঁধে ক্যামেরা। হাতে বুম নিয়ে তার অবিরাম ছুটে চলা। চলছে তো চলছেই। বিশ্রাম নেই। কিন্তু নিজ হৃদরোগের সবশেষ ‘প্যারা মিটার’ জানা নেই তার। গোপালগঞ্জের কোথায়, কোন প্রান্তে কী ঘটছে, সারমাতের সব জানা। হঠাৎ বেঁকে বসলো বুকের শিরা-উপশিরা। থেমে গেলো সারমাতের হৃদযন্ত্র। থেমে গেল ‘হৃদ কলমের টান’। খবর লেখার সব শক্তি। ক্যামেরার ক্লিক।
১০ অক্টোবর বড় অকালে ওপারে চলে গেল সাংবাদিক সারমাত। গোপালগঞ্জের মানুষ হারালো এক কীতির্মান মেধাবী, অন্ত:প্রাণ সাংবাদিককে।
মাহবুব হোসেন সারমাত আমার বল্যবন্ধু। সতীর্থ । গোপালগঞ্জ শহরের একই পাড়ায় (থানাপড়া) আমরা বড় হয়েছি। এসএম মডেল গভ: স্কুলে এক সাথে একই ক্লাসে পড়েছি। পরে বঙ্গবন্ধু কলেজেও একই সাথে। কোটালীপাড়া থেকে একই ক্লাসে যোগ দেয় সাংবাদিক, লেখক দীপঙ্ককর গৌতম। সারমাত ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। এ কারণে দীপঙ্কর ওকে দেখলেই, ডাক দিত, -মাইজ্যা ভাই বলে। সারমাত ওকে বলতো, ‘কমরেড লেনিনের দোস্ত’। দীপঙ্কর ছাত্র ইউনিয়ন করতো। তাই এ ‘খেতাব’!
স্কুলে আমি সাইন্সে। সারমাত আর্টসে। আমার চেয়ে ওর হাতের লেখা সুন্দর। গোটা গোটা। এখন তার মুখচ্ছবি ভেসে উঠলে, সাথে সাথে তার সুন্দর হাতের লেখাও ভেসে উঠে হৃদয়ে আয়নায়। আমাদের কমন বন্ধু সাংবাদিক আনোয়ারুল হক মিল্টন প্রথম সারমাতের মৃত্যু সংবাদ দিল। কিছুক্ষণ আমি বিহ্বল ছিলাম। পরে মনে পড়তে থাকে একের পর এক স্মৃতি। এখন কোনটা রেখে যে কোনটা বলি !
ইংরেজি ভালো পারতো সারমাত। স্কুলে আমাদের ইংরেজি পড়াতেন ফজলে আনোয়ার স্যার। ঢাকা বোর্ডের ইংরেজির হেড এক্সামিনার ছিলেন তিনি। আমরা স্যারের ডাক নাম পান্নু স্যার বলে ডাকতাম। স্যার পরীক্ষায় এমন সব ট্রানস্লেশন দিতেন। সঠিকভাবে লেখা কঠিন ছিল। না পারলে, এক কান টেনে ধরে, জোড়া বেতের বাড়ি। তবে ভয়ই বেশি দেখাতেন।
সারমাতকে স্যার খুব স্নেহ করতেন। এটা আমরা জানতাম। তাই ক্লাস নাইনের ফাইলাম পরীক্ষার আগে আমরা সবাই মিলে সারমাতকে প্রস্তাব দিলাম, তুই স্যারের কাছে একটা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস চেয়ে আনবি। তোকে স্যার দেবেনই। কারণ স্যার জানেন তোর সব পড়া মুখস্থ। পরে ওই সিলেবাস আমাদের দিবি। আজীবন বন্ধু বৎসল সারমাত। যে পরিকল্পনা, সেই কাজ। বন্ধুত্ব রক্ষা করতে সারমাত ইনিয়ে বিনিয়ে স্যারের কাছে প্রস্তব দিল। স্যার বুঝতেই চাইলেন না। সারমত নাছাড় বান্দা। এবার স্যার রেগে গেলেন। বাঘের মতো গর্জে বললেন, তোমরা প্রাইভেট পড় বলে কী আমারা মাথা কিনে নিয়েছ? হাতে তুলে নিলেন জোড়া বেত। আমরা তো স্যারের কন্ঠ শুনেই ভো- দৌড়। কেবল মার খেল সারমাত। বেদম মার। তখন আমরা এক বন্ধু আরেকজনকে ‘মামা’ বলতাম। বিসিক মাঠে নিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিলাম। ও বললো, মামা কোন ব্যাপার না। বন্ধুদের জন্য না হয় একটু মারই খেলাম! দুই একটা নাপা ট্যাবলেট খেলে ঠিক হয়ে যাবে। বন্ধুদের জন্য একটু সেক্রিফাইস কোনো ব্যপার না- এ নীতি সে সারা জীবন মেনে চলেছে। আমরা যারা নানা কারণে গোপালগঞ্জ ছেড়ে এসেছি- তাদের লোকাল স্টেশন ছিল সারমাত। কোনো সমস্য হলেই ফোন দাও সারমাতকে। মা- বাবার চিকিৎসা, জমির খাজনা, দলিল সংগ্রহ, ভাগ্নে-ভাগ্নিকে স্কুলে ভর্তি করানো, কোনা কাজে সাহায্য করেনি বন্ধু সারমাত? একদিনের জন্যও কখনো বিরক্ত হয়নি। কেবল যে প্রতিষ্ঠানের কাজ করে তাদের জন্য নয়, ঢাকা থেকে ছোট্ট কিন্তু ঐতিহাসিক গোপালগঞ্জে সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ যারাই কাজ কিংবা বেড়াতে গেছেন সারমাত তাদের সঙ্গ দিয়েছেন। সাধ্যমতো আপ্যায়ন করেছে।
কলেজ জীবনে ভাবতাম সারমাত অনেক ভালো করবে। নিদান পক্ষে বিসিএস দিয়ে কলেজের প্রভাষক তো হবেই। ভীষণ পড়ুয়া ছিল। কিন্তু সে হয়ে গেল সাংবাদিক। সম্ভাবত দৈনিক দিনকালের জেলা প্রতিনিধি দিয়ে শুরু। পরে আমার দেশ ও এনটিভিতে কাজ করেছে। দৈনিক আমার দেশের একদম শুরু থেকেই সারমাত ছিল। ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। শুরুতে আমি আজকের কাগজ থেকে ওই পত্রিকাতে সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে যোগ দেই। পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক প্রয়াত রশিদুন্নবী বাবু ভাই আমাকে বললেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য বিবৃতি সবিস্তারে ছাপবে আমার দেশ। যাতে কেউ বলতে না পারে আমরা কোনো দলের রাজনৈতিক দলের আদর্শ বিলং করি। এ জন্য গোপালগঞ্জে দক্ষ প্রতিনিধি লাগবে। আমি সারমাতের নাম প্রস্তাব করি। সহকর্মী মোস্তাফিজ শফিও সায় দেন। বাবু ভাই সারমাতকে মনোনীত করেন। এনটিভিতেও প্রথমে জেলা প্রতিনিধি ছিলো সারমাত, পরে স্টাফ রিপোর্টার। ২০০৪ সালের দিকে সারমাতকে আমি ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করি। ওকে নিয়ে দু’দিন হরতালের ডিউটি করি অফিসের সিএনজি স্কুটারে। শেষ দিনে পিকেটারদের ছোড়া্ ইট এসে পড়ে আমাদের স্কুটারে। তখন আমরা প্রগতি সারনিতে। পুলিশের টিয়ারসেলে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় চারপাশ। আমাদের চোখ দিয়ে কবল পানি ঝরে। চোখ খুললেই জ্বালা যন্ত্রনা। দুপুরে বাসায় খাবার খেতে এসেই সারমাত জানায় -নাইট কোচে সে বাড়ি যাবে। তার জন্য তার পুরানো জায়গাই ভাল। শান্তিময়। সংঘাতময় ঢাকায় সে থাকবে না। যে কথা সেই কাজ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গোপালগঞ্জেই সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিল বন্ধু আমার। তার পর ছুটে বেড়িয়েছে গোপালগঞ্জের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে। মাঝে হৃদরোগ বাসা বাঁধে বুকে।ডাক্তারের পরামর্শ ছিল – বিশ্রাম নিতে হবে। কে শোনে কার কথা। সারামাতকে থামাবে কে? সব কিছু তুচ্ছ করে বিরামহীন ছুটতে থাকতো তথ্যের পিছনে। সবার আগে খবর পৌছে দিতে হবে অফিসে। এ প্রতিযোগিতায় আজ নিজেই হয়ে গেছে খবর। সারমাতের তিন মেয়ে। বড় জন এইচএসসি পাশের খবর পেয়েছে বাবার মৃত্যূর দুদিন পর। জানি না ভবিষ্যত ওদের কোথায় নিয়ে যাবে? আমাদের সকলের প্রার্থনা ওরা যেখানেই থাকুন ভাল থাকুক। দক্ষিণের জনপদে অনেক অনেক দিন জাগ্রত থাকুক- সাংবাদিক মাহবুব হোসেন সারমাতের নাম।
লেখক: দৈনিক বাংলাদেশ সময়-এর ব্যাবস্থাপনা সম্পদক ও সভাপতি: পলিটিক্যাল রিপোর্টারস ফোরাম

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bartamangopalganj_16011
© All rights reserved © 2025